গণেশ হলেন হিন্দুধর্মের সর্বাধিক পরিচিত ও সর্বাধিক পূজিত দেবতাদের অন্যতম। তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী ব্যক্তি। তিনি গণপতি, বিঘ্নেশ্বর, বিনায়ক, গজপতি, একদন্ত ইত্যাদি নামেও পরিচিত। নেপাল , শ্রীলঙ্কা , থাইল্যান্ড , ইন্দোনেশিয়া সিঙ্গাপুর , মালয়েশিয়া , ফিলিপাইন , বাংলাদেশ , ফিজি, গায়ানা , মরিশাস এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগো সহ বৃহৎ জাতিগত ভারতীয় জনসংখ্যার দেশগুলিতে গণেশের প্রতি ভক্তি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। জৈন ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যেও গণেশ-ভক্তিবাদ মিশে গিয়ে গণেশ পূজার প্রথা বিস্তার লাভ করেছে। যদিও গণেশের অনেক গুণাবলী রয়েছে, তবে তিনি সহজেই তার হাতির মাথা দ্বারা চিহ্নিত হন। গণেশকে বিঘ্ননাশকারী, শিল্প ও বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক এবং বুদ্ধি ও জ্ঞানের দেবতা রূপে পূজা করা হয়। বিভিন্ন শুভকার্য, উৎসব ও অনুষ্ঠানের শুরুতেও তার পূজা প্রচলিত আছে। অক্ষর ও জ্ঞানের দেবতা রূপে লেখার শুরুতেও গণেশকে আবাহন করা হয়। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে গণেশ-সংক্রান্ত একাধিক পৌরাণিক উপাখ্যান পাওয়া যায়। এই উপাখ্যানগুলি থেকে গণেশের জন্মবৃত্তান্ত, লীলাকথা ও তার স্বতন্ত্র মূর্তিতত্ত্বের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
যদিও পণ্ডিতরা খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতাব্দী থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দীর মধ্যে তার জন্ম সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করেন, গণেশ গুপ্ত যুগে খ্রিস্টীয় ৪র্থ ও ৫ম শতাব্দীতে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন এবং বৈদিক ও প্রাক-বৈদিক পূর্বসূরিদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে বৈশিষ্ট পেয়েছিলেন। হিন্দু গ্রন্থে তাকে পার্বতী ও শিবের পুত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হিন্দুধর্মের গাণপত্য ঐতিহ্যে গণেশ হলেন পরম সত্তা।
চলুন জেনে নেই কেন সকল পূজার আগে গনেশ পূজা করা হয়ঃ
শিব এবং দেবী পার্বতীর দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন গণেশ। হিন্দুদের অন্যান্য পূজা গুলির মধ্যে আরেকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পূজা হলো গণেশ পূজা। হিন্দুধর্মের শাস্ত্র অনুসারে, সকল পূজার আগে গণেশের পূজা করতে হয়।। কিন্তু অন্যান্য দেবতাদের আরাধনা না করে সবার আগে কেন গণেশের পুজো করতে হয়? শুধু তাই সকল বাড়িতে বা কর্মস্থলে কোনো শুভ কাজ শুরু করার আগে গণেশকেই সবার প্রথমে স্মরণ করা হয়।
পুরাণমতে, এই ব্যাপারে সাধারণত দুইটি কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। একটি হলো দেবী পার্বতী চন্দন দিয়ে একটি পুতুল তৈরি করেন। কিন্তু সেই পুতুল এতটাই সুন্দর ছিল যে পার্বতী বললেন এতো আমার সন্তান। তারপর পুতুলের প্রাণ সঞ্চার করলেন পার্বতী। নিজের প্রথম পুত্র গণেশকে পার্বতী বললেন তিনি স্নানে যাবেন। কেউ যেন ঘরে না যায়। এমন সময় স্বয়ং শিবশম্ভু হাজির হয়। শিব দেখলেন কে একজন দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। অত কিছু না ভেবে মহাদেব ঘরে প্রবেশ করলেন কিন্তু তাকে বাঁধা দেন শ্রী গণেশ ঠাকুর। গণেশ বলেন মা কাউকে ঘরে প্রবেশ করতে মানা করেছেন। এই কথা শুনে মহাদেব প্রচন্ড রেগে যান। শেষ পর্যন্ত ত্রিশূলের আঘাতে গণেশের মস্তক কেটে ফেলেন। তার ক্রন্দন শুনে বেরিয়ে এসে দেবী পার্বতী শোকগ্রস্ত এবং রাগান্বিত হয়ে পরেন। তার রাগে সৃষ্টি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। দেবীর রাগ প্রশমন করতে পিতা শিবশম্ভু একটি হস্তি সাবকের মাথা কেটে এনে বসিয়ে দিলেন গণেশের ঘাড়ে। সে সাথে গণেশকে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন যে সকল দেবতারদের আগে গনেশ পুজিত হবেন।
অনেকের মনে প্রশ্ন আসে যে আমাদের অনেক শক্তিশালী দেবতা রয়েছেন। কিন্তু গণেশ পূজা কেন আগে করা হয়। পৌরাণিক মতানুসারে, প্রাচীনকালে একবার দেবতাদের সভা হয়েছিল এবং প্রসঙ্গ উঠেছিল কে সেরার থেকে সেরা? সকল দেবতাই নিজেকে সেরা মনে করেছিলেন। কিন্তু এভাবে সমাধান হচ্ছিল না। অতএব ঠিক হল যে দেবতারা ত্রিলোক চতুরদিকে ভ্রমণ করে এই স্থানে যে প্রথমে পৌঁছাবেন তিনিই সেরা এবং তার পূজা প্রথমে করা হবে। এ শুনে সকল দেবতা নিজে নিজে বাহনে চড়ে ত্রিলোক ভ্রমণ করতে চলে গেলেন। কিন্তু ভারী শরীরে গণেশ নিজে বাহন মুষিক সহ রয়ে গেলেন। কিন্তু তিনি সাহস ও ধৈর্য হারালেন না। সেখান থেকে মাতা-পিতা যেখানে ছিলেন সেখানে গেলেন। পিতা মাতাকে তিনবার প্রদক্ষিণ করে ফিরে এলেন। সবার আগে কার্তিক ময়ূরে চড়ে ত্রিলোক প্রদক্ষিণ করে এসে গণেশকে বাবা-মায়ের কোলে বসে লাড্ডু খেতে দেখে ভীষণ রেগে গেলেন। তখন গণেশ সকল দেব-দেবতাদের সামনে যুক্তি দিলেন ত্রিলোকের সকল সুখ আনন্দ মাতা-পিতার চরণে বিদ্যমান রয়েছে। মাথা পিতার চরণের সেবাই সর্বোত্তম। যারা উনাদের চরণ ছেড়ে ত্রিলোক ভ্রমণ করেন তাদের সকল পরিশ্রম বৃথা হয়ে যায়। ভগবান গণেশের বিশাল মস্তক আমাদের লাভবান হওয়ার বিচার গ্রহণ করার প্রেরণা দেয়। মোটা পেট হজম শক্তি এবং সহনশীলতার প্রতীক। এই সকল গুণ অন্য কোনো দেবতার মধ্যে নেই। সেই থেকেই গণেশ সকলের আগে পূজিত হয়ে উঠলেন। এভাবেই সকল পূজার আগে গণেশ পূজার রীতিনীতি ও নিয়ম কানুন চালু হয়েছিল।
গণেশ পূজা ২০২৩ তারিখ ও সময়সূচীঃ
বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে,
১ লা আশ্বিন, বাংলাদেশ ৪ আশ্বিন, ইং ১৯ সেপ্টেম্বর, হিঃ ৩ রবিঃ আউঃ।
(অমৃতযোগঃ দিবা ঘ ৬ টা ৫১ মিনিট মধ্যে ও ৭ টা ৩৮ গতে ১১ টা ৩০ মধ্যে। রাত্রি ঘ ৮ টা ১১ মিনিট গতে ৯ টা মধ্যে ও ৯ টা ৫০ গতে ১২ টা ১৮ মধ্যে ও ১ টা ৫৭ মিনিট গতে ও ৩ টা ৩৬ মিনিট মধ্যে ও ৫ টা ১৫ মিনিট গতে ৫ টা ৫৭ মিনিট মধ্যে। পঞ্চমীর একোদ্দিষ্ট ও সপিগুন।
ঘ ১১ টা ২৫ মিনিট ১২ সেকেন্ড মধ্যে নির্ণয়সিন্ধুমতে বরদা চতুর্থী, সিদ্ধি বিনায়কব্রতম্, শ্রীশ্রী গণেশ পূজা, সৌভাগ্য চতুর্থীব্রতম্, গণেশ চতুর্থী, অত্র পার্বতী পূজা, হরিতালী চতুর্থী, গোস্বামী মতে শ্রীকৃষ্ণ কলঙ্কিনী ব্রতম্, মহারাষ্ট্রে দশ দিনব্যাপী শ্রী শ্রী গণেশ পূজা ও উৎসব।
মাহেন্দ্রযোগঃ রাত্রি ঘ ৮ টা হতে ১১ মিনিট মধ্যে।
গণেশ চতুর্থীর তাৎপর্যঃ
গণেশ পূজা ভারতের সর্বত্রই অনুষ্ঠিত হলেও, এই উৎসবটি বিশেষ করে কর্ণাটক, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র অথবা মুম্বাই, মধ্যপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, গুজরাট, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও ছত্রিশগড় রাজ্যে খুবই ধুমধাম করে পালন করা হয়। তাছাড়া শ্রীলঙ্কা তে তামিল হিন্দুরাও এই গণেশ উৎসব ধুমধাম করে পালন করে থাকেন।
শাস্ত্র অনুসারে, সব শুভ কাজের শুরু হয় শ্রী গনেশের নাম উচ্চারণ করে। আর তাই সকল কাজে সফলতাও আসে। গণেশ পূজা বাদ দিয়ে কোন পূজাই সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। দেবতাদের মধ্যে তাকেই প্রথম পূজনীয় বলে মানা হয়। এছাড়া গণেশের প্রায় ১০৮ টি নাম আছে, এর মধ্যে গজানন, গণপতি, বিনায়ক এবং বিঘ্নরাজ, এই নামগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার পাশাপাশি গণেশ হলেন সমৃদ্ধির প্রতীক, তাই তার আরেক নাম হলো সিদ্ধিদাতা গণেশ।
জীবনে সকল সংকট থেকে পরিত্রান পেতে পারেন এবং যা বাধা-বিপত্তি আছে সেগুলি বিনাশ করেন সিদ্ধিদাতা গণেশ। ব্যক্তিগত এবং পেশাগত জীবনের নানা রকম সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে ভক্তরা গণেশ চতুর্থী পূজা পালন করে থাকেন।
গণেশ চতুর্থীর শেষ দিনকে বলা হয় অনন্ত চতুর্দশী। আর ১১ তম দিনে গণেশ কে ভাসানো হয়ে থাকে গঙ্গায় অথবা এখন অনেকে বড় পানির ট্রাঙ্ক নির্মাণ করে সেখানে গণেশের বিগ্রহ বিসর্জন দিয়ে থাকেন।
আজকের রাশিফল বিস্তারিত পড়ুন: banglarashifol.com
