রহস্যঘেরা কৈলাস পর্বতের ইতিহাস পর্বঃ ৩। চলুন জেনে নেই সেই অদ্ভুত সব রহস্য!

 

কৈলাস পর্বতের উৎপত্তি
প্রথমদিকের মহাদেশগুলোর সংঘর্ষে তৈরি হয়েছিল এ পর্বত বলে জানা যায়। একটি মহাসাগরের অন্তিম সময় আর পর্বতমালার শিলার জন্মের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এ কৈলাস পর্বত। এর ভূ-তাত্ত্বিক গুরুত্ব কোনো অংশেই এর পারমার্থিক গুরুত্বের চেয়ে কম নয়। ভূ-তত্ত্ব আর রহস্যবাদ এসে মিশে গেছে কৈলাসে।

এ পর্বতের একদম চূড়ায় কোনো বরফ জমে না। কারণ পর্বতটি এতটাই খাড়া যে, বরফ নিচে পড়ে যায়। আর ওই বরফ গলে গিয়ে সৃষ্টি হয় নদীগুলোর। মরুভূমির মতো স্থানে শ্বেত-শুভ্র পর্বত হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে কৈলাস। হিমালয়ের প্রথম ও প্রধান স্থান হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে পর্বতটি।

যদিও কেউ এখনো এর চূড়ায় উঠতে পারেনি তবে লাখ লাখ তীর্থযাত্রী হাজার বছর ধরে এর আশেপাশে ঘুরছে সুখী হওয়ার ইচ্ছায় ও আকাঙ্ক্ষায়। অনেকেই বারবার অবনত হয়ে পর্বতের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানাতে চারপাশে যে ৫০ কিলোমিটার ট্র্যাক আছে, সেই পথে হেঁটেছেন। বিখ্যাত পর্বতারোহী “রেইনহোল্ড মাইসনার” এর চূড়ায় আরোহন করার অনুমতি চাইলে চীনের সরকার তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

হিমালয়ে অবস্থিত কৈলাস পর্বত সেখানকার সবচেয়ে উঁচু পর্বত না হলেও এই পর্বতের চূড়ায় কেউ আরোহণ করেনি। কারণ, এটা বিশ্বাস করা হয় যে কৈলাস পর্বতে ওঠার চেষ্টা করা করা দেবতাদের অপমান করার সমতুল্য। তবে লোকমতে, প্রাচীন কিংবদন্তী অনুযায়ী “মিলারেপা” নামে একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এ পর্বতে করতে ওঠতে সক্ষম হয়েছিলেন। চারজন পর্বতারোহী এই পর্বতে ওঠার সময় মারা গিয়েছিলেন। ধর্মীয় বিশ্বাস হোক বা প্রাকৃতিক কারণ, কৈলাস পর্বতে ওঠা যেন একপ্রকার নিষিদ্ধ কাজ।

বিজ্ঞানীদের অনুমান, কৈলাস পর্বতের চূড়াটি আসলে একটি মানুষ সৃষ্ট ভ্যাকুয়াম পিরামিড, এবং এটি ১০০টিরও বেশি ছোট পিরামিড দিয়ে তৈরি। প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, পিরামিড কমপ্লেক্সের উচ্চতা ১০০ থেকে ১,৮০০ মিটারের মধ্যে, যেখানে মিশরীয় পিরামিডের উচ্চতা মাত্র ১৪৬ মিটার। এই অনুমান যদি সত্য হয়, তবে এটি আজকের যেকোনো পরিচিত পিরামিডের চেয়ে বড় হবে।

ধর্মীয় প্রত্যয়ের দিক থেকে একে পৃথিবীর কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়। তবে ভৌগলিক অবস্থানের দিক থেকে এর বিশেষত্ব রয়েছে। কারণ, যুক্তরাজ্যের স্টোনহেঞ্জ থেকে এর দূরত্ব ৬,৬৬৬ কিলোমিটার, যা কৈলাস থেকে উত্তর মেরুর দূরত্বও অনুসারে। আবার কৈলাস থেকে দক্ষিণ মেরুর দূরত্ব ১৩,৩৩২ কিলোমিটার, যা উত্তর মেরু বা স্টোনহেঞ্জের দূরত্বের তার দ্বিগুণ।

কিছু নৃবিজ্ঞানীর কথা অনুসারে, কৈলাস পর্বতমালায় এমন কোনো শক্তি রয়েছে যা শরীর এবং মনকে উতলা করে। বলা হয়ে থাকে, কৈলাসের আশেপাশে যারা ১০-১২ ঘন্টা সময় ব্যয় করেন, তাদের চুল এবং নখের বৃদ্ধি এত বেশি হয় যে যা স্বাভাবিক সময়ের দুই সপ্তাহের সমান!

কৈলাস পর্বতের নিচে দুটি হ্রদ রয়েছে। একটি মানস সরোবর হ্রদ ও আরেকটি রাক্ষস তাল হ্রদ। মানস সরোবর হ্রদটি পবিত্র এবং এটি একটি মিঠা পানির হ্রদ। আবার রাক্ষস তাল হ্রদ একটি লবণাক্ত জলের হ্রদ যা ভূতের হ্রদ হিসেবে জনশ্রুতি আছে। মানস সরোবরের একটি বৃত্তাকার আকৃতি রয়েছে যা সূর্যের অনুরূপ এবং রাক্ষস তাল দেখতে অর্ধচন্দ্রের আকার অনুসারে। এজন্য হ্রদ দুটি যথাক্রমে আলো ও অন্ধকারের নিবেদন করে।

যখন সূর্য ডুবে দেয়, তখন পর্বতের ছায়া এমনভাবে পড়ে যে ধর্মীয় প্রতীক স্বস্তিকার সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যা হিন্দুদের মধ্যে একটি শুভ চিহ্ন হিসেবে প্রচলিত রয়েছে।

হিমালয়ের কৈলাস এবং কাছাকাছি মানস সরোবর হ্রদ থেকে এশিয়ার সিন্ধু, গঙ্গা, সতলজ নদী এবং ব্রহ্মপুত্র নদের জন্ম হয়েছে। সেখান থেকে উৎপন্ন হয়ে চারটি নদী হাজার হাজার মাইল পথ প্রবাহিত হয়ে ভারত মহাসাগরে মিলিত হয়েছে।

দক্ষিণ দিক থেকে দেখলে কৈলাস পর্বতের গায়ে ওম (ॐ) চিহ্ন আছে বলে অনুভূত হয়। বিশেষত পাহাড়ের চূড়া থেকে বিশাল বরফের গর্ত এবং অনুভূমিক শিলা গঠনের ভূপ্রাকৃতিক কারণে এরূপ আকৃতি গঠন করে। তবে ধর্মীয় দিক থেকে এই বিষয়টি প্রত্যয়ের সাথে জড়িত।

হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বেদে যেমন উল্লেখ আছে, কৈলাস পর্বত স্বর্গ ও পৃথিবীর মধ্যে একটি সিঁড়ি। মহাভারত অনুসারে, পাণ্ডবরা তাদের একমাত্র স্ত্রী দ্রৌপদীর সাথে মোক্ষ অর্জনের জন্য কৈলাস পর্বতে আরোহণ করেছিলেন। স্বর্গে যাওয়ার পথে, যুধিষ্ঠির ব্যতীত সকলেই চূড়ায় আরোহণ করার সময় একে একে পিছলে গেল। এটা বিশ্বাস করা হয় যে স্বর্গের দরজা শুধুমাত্র যুধিষ্ঠিরের জন্য উম্মুক্ত করা হয়েছিল। পিরামিড আকৃতির কৈলাস পর্বতের চারটি ঢাল কম্পাসের চারটি দিকের দিকে মুখ করে রয়েছে, যা একে পরিপূর্ণতার চিহ্ন করে তোলে। শিষ্যরা তীব্রভাবে বিশ্বাস করে যে এটি স্বর্গের প্রবেশের দরজা।

কৈলাস পর্বত গ্রানাইট দিয়ে গঠিত। এ পর্বতের চারটি মুখ চারটি দিক, যেমন- উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব এবং পশ্চিম দিকে মুখ করে আছে। ধর্মীয় প্রত্যয়ে, এই পর্বত তার চারটি দিক থেকে বিভিন্ন শক্তি নির্গত করে। প্রাচীন হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বিষ্ণু পুরাণে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে- কৈলাস পর্বতের পশ্চিম মুখ চুনি বা পদ্মরাগমণি দিয়ে, দক্ষিণ মুখ নীলকান্তমণি দিয়ে, উত্তর মুখ স্বর্ণ দিয়ে এবং পূর্ব মুখ ক্রিস্টাল বা স্ফটিকের মতো মূল্যবান পাথর দিয়ে গঠিত। এটি কৈলাস পর্বতের রহস্য নিয়ে আরও একটি প্রচলিত বিষয়।

কেউ কেউ দাবি করেছেন যে তারা রাতে কৈলাস পর্বতের কাছ থেকে অদ্ভুত ফিসফিস আওয়াজ শুনতে পান।
প্রকৃতপক্ষে, এই কৈলাস পর্বত রহস্য ড. আর্নস্ট মুল্ডাশিফের লেখা একটি বইয়েও নথি যুক্ত করা হয়েছে। কৈলাস পর্বতের নিঃশব্দ প্রাসাদ থেকে আসা অদ্ভুত ফিসফিসের ব্যাপারে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন।
অন্য একরাতে ড. মুল্ডাশিফ এবং তার দলের সদস্যরা পাথর পড়ার একটি ভয়ানক শব্দ শুনতে পান যা কৈলাস পর্বতের ভেতর থেকে আসার মতো মনে হয়েছিল। তার মতে, এটা খুবই সম্ভব যে এখনও কিছু জীবিত প্রাণী কৈলাস পর্বতের পিরামিডের ভেতরে বাস করে।

এটি কৈলাস পর্বতের সেই রহস্যগুলোর একটি যা দীর্ঘকালীন ধরে বিতর্ক চলছে। তিব্বতি ঋষিদের মতে, কৈলাস পর্বতের আশেপাশের অঞ্চলে অতিপ্রাকৃতিক শক্তি রয়েছে যা বর্ণনা করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে, তিব্বতীরাও বিশ্বাস করে যে রহস্যময় শহর শাম্ভালাও কৈলাস পর্বতের আশেপাশের অঞ্চলে অবস্থিত। বৌদ্ধদের প্রত্যয় মতে, সিদ্ধা এবং তপস্বী লোকেরা এখনও রহস্যময় শাম্ভালা শহরে বাস করে।

অনেকে বলেন, কৈলাস পর্বত ভেতর থেকে ফাঁপা। কেউ কেউ আবার দাবি করেছেন, ‘ওম’ শব্দ কৈলাস পর্বত থেকে আসে। কোনো কোনো বিজ্ঞানীর আবার দাবি, এই শব্দ আসলে বরফ গলার আওয়াজ। বলা হয়, যখন শব্দ ও আলো মিলিত হয়, তখনই ‘ওম’ শব্দটি উৎপন্ন হয়।

মানস সরোবর হ্রদের রহস্যময় আলো কৈলাসের সবচেয়ে বড় রহস্য। বেশ কয়েকবার মানস সরোবর হ্রদের উপরে রহস্যময় আলো দেখা গেছে। এছাড়া এলিয়েন নিয়েও এই পর্বতকে ঘিরে রয়েছে বেশ কিছু অজানা সত্য। অনেক অভিযাত্রীর ভাষ্যে, তারা কৈলাস পর্বতের আশেপাশে রহস্যময় আলোর পাশাপাশি ‘এলিয়েন শিপ’ দেখেছে! অনেকের ধারণা, কৈলাস আসলে এলিয়েনদের গোপন শহর, যেখানে তারা একটি নির্দিষ্ট সময়ে এসে সকলে একসাথে আলোচনা করে।

তবে এতসব রহস্য থাকলেও কৈলাস পর্বত ধর্মীয় দিক থেকে একটি অনন্য জায়গা দখল করে আছে। এই পর্বতের রহস্য উদঘাটন করতে না পারলেও এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত বিস্ময়কর ও আশ্চর্যজনক ঘটনা অবশ্যই মানুষকে বিমোহিত আনন্দিত এবং উদ্দীপিত করবে।

 

আরো আপডেট পেতে

Bangla Panjika 2023 Paji 1430 Download করুন

error: Content is protected !! Without permission do not copy the content. We will sue you if you copy the content without permission.